নববর্ষটি ইংরেজি নববর্ষ নয়
অবশেষে ১৭০০ সালে গোটা জার্মানিতে চালু হলো এই নতুন ক্যালেন্ডার। ইংরেজরা আরো এক কাঠি সরেস। তারা ১৭৫২ সালে পার্লামেন্টে আইন পাস করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। তাই এ ক্যালেন্ডারকে কোনোমতেই ইংরেজি ক্যালেন্ডার বলা যায় না। আন্তর্জাতিকভাবে বহু দেশে গৃহীত হওয়ার ফলে এর গুরুত্ব, মর্যাদা ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। এ ক্যালেন্ডারকে রোমান বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার বলা যায়। একে ইংরেজি ক্যালেন্ডার বা এর প্রথম দিনকে ইংরেজি নববর্ষ বলা অজ্ঞতার পরিচায়ক। আর আজ তাই রোমান ক্যালেন্ডারের নববর্ষ বা আন্তর্জাতিক নববর্ষ।
আজ ১ জানুয়ারি, যে বছরটি শুরু হলো তাকে আমরা বলবো ২০১০ সাল। আজ ২০১০ সালের নববর্ষ। কিন্তু এই সালকে এবং নববর্ষের প্রথম দিনকে কোন নামে অভিহিত করবো? ধারণা করি, প্রায় সবাই বলবেন, এটা কি কোনো প্রশ্ন হলো? নতুন সালকে বলবো ‘২০১০ ইংরেজি’ সাল, আর আজকের দিনটিকে বলবো ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন। প্রায় সবাই এই ধরতাই বুলি উচ্চারণ করলেও দুটি উত্তরই ভুল। আজ যে নববর্ষ শুরু হচ্ছে তা ইংরেজি বর্ষের প্রথম দিন না এবং বছরটি বা পঞ্জিকাবর্ষটির নাম ইংরেজি সাল বা সন নয়। কেউ কেউ একে খ্রিস্টীয় সন বা খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের সন বলে, তা বলাও অসঙ্গত। এই সন বা এই সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী দিনক্ষণ গণনার যে নিয়মকানুন প্রস্তাবিত হয়েছিল এবং নানা সংস্কারের মধ্য দিয়ে এখন যে প্রায় সারা পৃথিবীব্যাপী প্রচলিত সালটি আমরা পাচ্ছি ও দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করছি - তার প্রস্তাব, প্রচলন ও সংস্কারের সঙ্গে ইংরেজ জাতির কোনো সম্পর্ক নেই; বরং দীর্ঘকালব্যাপী বিরোধিতার ইতিহাস আছে। তারা এই সাল শেষ পর্যন্ত অন্য অনেক দেশের মতো গ্রহণ করেছে, কিন্তু সে বহু বহু বছর পরে। তাই এই সাল এখন অন্য অনেকের যেমন, তেমনি তাদেরও। এই সাল প্রবর্তনের কৃতিত্ব ইংরেজদের দেয়ার কোনো উপায় নেই।
এই সালের চিন্তা, এর উদ্ভাবনা ও নানা সংস্কারের চমৎকার ইতিহাস আছে এবং তার সবই হয়েছে রোমে, রোমান সম্রাট, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও সন-তারিখ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে। তাই এ সালকে রোমান ক্যালেন্ডারের সাল বলাই সঙ্গত ও ইতিহাসসম্মত। প্রচলিত ভুলে একে অনেক শিক্ষিত লোকও ইংরেজি সাল বা ক্যালেন্ডার বলেন বটে, তবে তা নিতান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত।
ক্যালেন্ডারের ইতিহাস জটিল, তাছাড়া এর সঙ্গে মানুষের আবেগ-অনুভূতির গভীর যোগ থাকে। তাই সংস্কার কাজও খুব সহজ হয়নি। ক্যালেন্ডারের ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করলে দুটি বিষয় প্রাচীন ক্যালেন্ডারে দেখা যায় -
১. বেশিরভাগ বর্ষপঞ্জিতেই বছর ৩৫৪ দিনে। অতএব এসব ক্যালেন্ডার ছিল চন্দ্রবর্ষভিত্তিক বা চাঁদের হিসাবমতো। যেমন চীনে ৩৫৪ দিন, গ্রিকে ৩৫৪ দিন, ইহুদিদের ৩৫৪ দিন এবং হিজরি ৩৫৪ দিনে। তবে চান্দ্র ক্যালেন্ডার হলেও জুলিয়াস সিজারের আগের রোমান ক্যালেন্ডারে ছিল ৩০৪ দিনে বছর। ৭০০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দের সংস্কারের ফলে হয় ৩৫৫ দিনে;
২. প্রায় সব দেশে বছরের শুরু হতো বসন্তে। বাংলা সনও এখন বসন্তের পরে গ্রীষ্মকালে শুরু হয়। আগে নাকি অগ্রহায়ণে শুরু হতো। প্রাচীন রোমানদের বর্ষ শুরুর মাসের নাম ছিল ‘মার্তিয়ুস’, একে এখন বলা হয় মার্চ। এর পরের মাস তিনটি আপ্রিলস, মাইয়ুস, ইয়নিয়ুস- এখনকার এপ্রিল, মে ও জুন। এসব দেবদেবীর নামে করা হয়েছে। পঞ্চম মাসের নাম ছিল কুইন্তি লিস আর ষষ্ঠ মাসের নাম সেক্সতিলিস। এর পরের নামগুলো প্রায় বর্তমান কালের মতো সেপ্তেম্বর, অক্তোবর আর দেকেম্ব^র। পরের দুই মাস শীতের মাস, তখন মানুষ অনেকটা বিচেতন (Hibernation) অবস্থায় চলে যেতো, জীবন স্থবির হয়ে পড়তো। বিচেতন মানুষের আবার দিন-মাসের কী প্রয়োজন? তাই এ মাস দুটির কোনো নামই নেই, বছরের হিসাব থেকেও বাদ, অর্থাৎ এখনকার নতুন বছরের প্রথম মাস ও দ্বিতীয় মাস জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, তখনকার পঞ্জিকার শেষ দু’মাসের অস্তিত্বই ছিল না। পরে অবশ্য তাদের নামকরণ করা হয় দুই দেবতার নামে জানুস বা ইয়ানুয়ারিয়ুস আর ফেব্রুয়ারিয়ুস। এই দুই মাসের নামকরণের আগে যে ১০ মাসের অস্তিত্ব ছিল তাতে মার্চ, মে, জুলাই (কুইন্তিলিস) আর অক্টোবর ছিল ৩১ দিনে, বাকি ছয় মাস ৩০ দিন করে। ফলে বছরের দিনের সংখ্যা ছিল ৩০৪। ৩০৪ দিনে বছর, খুব অবাক ব্যাপার, তাই না! ওই যে শীতের দুই মাস বিচেতন অবস্থায় থাকতো, তখন আর দিনক্ষণের হিসাব দিয়ে কী হবে! তাই ওই দুই মাস বাদ বছর থেকে। মার্চ মাসে বসন্তের হাওয়া গা-গরম হলে নতুন বছরের আবার সামাজিক জীবন ও দিন-তারিখের হিসাব শুরু। এই ছিল সেকালের রোমকদের ব্যবস্থা।
ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা, অর্থাৎ দিনক্ষণের হিসাব নিয়ে বেশ রহস্যজনক, উদ্ভট ও মজার ব্যাপারও আছে। আমাদের দেশে ‘আঠার মাসে বছর’ বলে একটা প্রবাদ আছে। খুঁজে পেতে দেখলাম, মায়া সভ্যতায় তিন ধরনের ক্যালেন্ডার পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। এর প্রথমটার নাম হাব (ঐধন)। এ পদ্ধতিতে আঠার মাসে বছর হতো, তবে দিন ছিল ৩৬৫টি। এতে প্রতি মাস ছিল ২০ দিনে আর পাঁচটি অতিরিক্ত দিন তাতে যুক্ত করে নেয়া হতো।
আমরা এবার রোমান ক্যালেন্ডারের সংস্কারের কথা বলি। খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ সালের দিকে রোমান ক্যালেন্ডারের সংস্কার শুরু হয়। রাজা নুমা পস্পিলিয়ুস সবাইকে শীতকালের দীর্ঘ ঘুম থেকে জাগিয়েছিলেন। অর্থাৎ তিনি জানুস বা ইয়ানুয়ারিয়ুস (যে দেবতার এক পা আগে ও আরেক পা ছিল পেছনে) আর ফেব্রুয়ারিয়ুস নামের দুই দেবতাকে ক্যালেন্ডারে স্থাপন করে চালু করলেন জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস। তখন চান্দ্র বছরের নিয়ম হিসেবে বছরে দিনের সংখ্যা হওয়ার কথা ৩৫৪। কিন্তু এ নিয়ে দেখা দিল নতুন ফ্যাকড়া। পশ্চিমের দুনিয়ায় ‘তের’ সংখ্যাকে যেমন অশুভ ভাবা হয়, রোমানদের তেমনি সংস্কার ছিল জোড় সংখ্যাকে নিয়ে। সংস্কারজনিত ভয় তাদের ক্যালেন্ডার সংস্কারেও প্রভাব ফেললো। ফলে ৩১ দিনের মাসগুলো বেজোড় বলে টিকে গেল। কিন্তু ৩০ দিনের মাসগুলো হয়ে গেল ২৯ দিনের। নতুন চালু জানুয়ারির দেবতাকেও ২৯ দিনেই আবদ্ধ করা হলো। সে ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারির জন্য ২৭ দিন নির্ধারণ করে দিলে সব ঝুট-ঝামেলা মিটে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। গোটা বছরে দিনের সংখ্যা যে আবার তাতে হয়ে যায় ৩৫৪। সেও তো এক অলক্ষুণে জোড় সংখ্যা! সারা বছর ধরে অশুভের ছায়ার নিচে থাকতে চাইলো না রোমানরা। তবে বেউপায় হয়ে একটা মাসে জোড় সংখ্যা মেনে নিল। ধরে নিল, দেখতে দেখতে চলে যাবে এমন একটা মাস। তাই শেষ মাস ফেব্রুয়ারিকে দেয়া হলো ২৮ দিন (ফেব্রুয়ারি ২৩ দিনে শেষ হতো এমন নজিরও আছে)। তাতে বছরে দিনের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৫৫। আরো অদ্ভুত কিছু নিয়ম ছিল রোমান ক্যালেন্ডারে। যাজকদের যে দিন-তারিখের সুসাম্যের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল তার অপব্যবহারের নৈরাজ্য দেখা দেয় দিন-মাসের হিসাব নিয়ে। এই অরাজক অবস্থা দূর করার জন্য জুলিয়াস সিজার রোমের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে পঞ্জিকা সংস্কারে হাত দেন। দিন-পঞ্জিকার ব্যাপারে মানুষের সংস্কার এতো দৃঢ়মূল প্রোথিত থাকে যে, এর সংস্কার খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু জুলিয়াস সিজার ছিলেন শক্ত মানব এবং স্বৈরশাসক। অতএব শক্ত হাতেই তিনি সংস্কার কাজে হাত দিলেন। রোমে তখন যুদ্ধবিগ্রহের কারণে এবং যাজকদের স্বেচ্ছাচারমূলকভাবে প্রতি বছর ২৩ দিন নিবেশনের নিয়ম রক্ষা না করায় ঋতুর হিসাবের সঙ্গে ক্যালেন্ডারের হিসাব মিল ছিল না। ফলে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়।
জুলিয়াস সিজার খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে দুটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেন- এক. সবাই যা করে সেই মতো ২৩ দিন নিবেশন করে বছরের সঙ্গে আরো ৬৭ দিন যোগ করে দিলেন। ফলে মোট ৯০ দিন যোগ হওয়ায় ওই বছরে দিনের সংখ্যা হলো ৪৫৫। এতে ২৩ দিন নিবেশন না করায় পিছিয়ে পড়া সময় আবার ঠিকঠাক হলো। ফলে ক্যালেন্ডার নৈরাজ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই যাতে শীতে জেঁকে বসতে না পারে, তার ব্যবস্থা হলো। কিন্তু এ হলো অ্যাডহক ব্যবস্থা। এবার এমন মৌলিক পদক্ষেপ চাই যাতে ভবিষ্যতে সময় আর অমন পিছিয়ে পড়তে না পারে। এটা সম্ভব হয়েছিল সিজার সাংবিধানিকভাবে যাজকদেরও তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিলেন বলে।
আমাদের দেশেও যেমন পঞ্জিকাপ্রণেতারা দিনক্ষণ-তিথি লগ্নের কথা বলে পঞ্জিকার ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসার জন্য স্বেচ্ছাচার চালায়, রোমের যাজকরাও তাই করতেন। ফলে দিন-তারিখের অরাজকতা বন্ধ করা যাচ্ছিল না। জুলিয়াস সিজার সাধারণ লোকেরা বুঝতে পারে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম বেঁধে দিলেন। সিজার চন্দ্রকলার সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের বিষয়টি খারিজ করলেন। তিনি সৌর বছর এবং ঋতুর সমন্বয়ের ওপর জোর দিলেন। ফলে চান্দ্র বছরের জায়গায় সৌর বছর চালু করা হলো। তবে মাস ১২টিই থাকলো, কিন্তু তার দিন ভাগ হলো কাজের সুবিধার দিকে লক্ষ্য রেখে। জুলিয়াস সিজার যাজকদের বাদ দিয়ে মিসরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সোসিজেনেসকে সভা জ্যোতির্বিজ্ঞানী করে তার পরামর্শমতো বছরের দিন সংখ্যা করলেন ৩৬৫। এতে অবশ্য একটু অসঙ্গতি থাকলো। সিকি দিনের হিসাব মেলানোর জন্য প্রতি চার বছর অন্তর ২৩ ফেব্রুয়ারিকে দু’বার গণনা করা হতো। রোমানদের জোড় সংখ্যা সংস্কার তিনি মানলেন না। ফলে তার মাসের দিন বিভাজন হলো এভাবেÑ জানুয়ারি ৩১, ফেব্রুয়ারি ২৯/৩০, মার্চ ৩১, এপ্রিল ৩০, মে ৩১, জুন ৩০, জুলাই ৩১, সেক্সতিলিশ ৩০, সেপ্টেম্বর ৩১, অক্টোবর ৩০, নভেম্বর ৩১, ডিসেম্বর ৩০। জুলিয়াস সিজার নিজের নামও যুক্ত করলেন এ ক্যালেন্ডারে। আগের পঞ্চম মাস কুইন্তিলিস তার নামের অনুসঙ্গে হয়ে গেল জুলাই এবং তা ৩১ দিনের মাস।
সিজারের সংস্কার ঠিকমতো বুঝতে না পারায় একটা ভুল থেকে যায়। সিজার লিপইয়ার বা অধিবর্ষ প্রবর্তন করেছিলেন এবং বলেছিলেন, দুই অধিবর্ষের মধ্যে ফারাক হবে তিন বছরের। রোমানরা প্রত্যেক তৃতীয় বছরে অধিবর্ষ ধরে। সিজার নিহত হওয়ায় এ ভুল ধরা পড়ে ৩৮ বছর পরে। তখন নয়টি অধিবর্ষের জায়গায় বারটি অধিবর্ষ ধরা হয়ে গেছে। নতুন সিজার আগাস্টাস এর নিদান দিলেন, এরপর তিনটি অধিবর্ষকে সাধারণ বর্ষ ধরতে হবে, তাহলেই ভুলের সংশোধন হবে। এই সংশোধনের পরে আগের সিজারের অনুকরণে তিনিও তার নাম যুক্ত করলেন ক্যালেন্ডারে। শুধু তাই নয়, জুলাইয়ের পরে সেক্সতিলিশকে তার নামে শুধু আগস্টের নামকরণই করলেন না, জুলাইয়ের মতো আগস্টও হলো ৩১ দিনে। ফলে সেপ্টেম্বর থেকে ১ দিন ছেঁটে দিতে হলো। আর সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের দিনবিন্যাস হলো ৩০, ৩১, ৩০, ৩১ এই ক্রমানুসারে। আগাস্টাস নিজ নামের মাসের একটা দিন যে বাড়ালেন, তার বিন্যাসজনিত খ—গটা পড়লো গিয়ে ওই ফেব্রুয়ারি মাসের ওপর, অর্থাৎ সাধারণ মাসে ফেব্রুয়ারি ২৮ দিনে, অধিবর্ষে ২৯ দিনে। জুলিয়াস সিজারের ক্যালেন্ডার সংস্কারের ৩৭১ বছর পর, অর্থাৎ ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে এশিয়া মাইনরের নিকেয়া শহরে খ্রিস্টান যাজকদের এক সম্মেলন বসে। তারা জুলিয়াস সিজারের পঞ্জিকা সংস্কারের একটা খুঁত পেলেন। ইস্টারের উৎসব উদযাপনের জন্য বাসন্তীবিষুবের দিনটি কবে পড়ে, তা জানা দরকার। সিজারের জ্যোতির্বিজ্ঞানী সোসিজেনেস দেখিয়েছিলেন, ২৫ মার্চ হয় বসন্তবিষুব; কিন্তু নিকেয়ার সম্মেলনে দেখা গেল তা হবে ২১ মার্চ।
জুলিয়াস সিজারের হিসাব অনুযায়ী বছরের গড় দৈর্ঘ্য ছিল ৩৬৫.২৫ দিন। আর এখনকার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে নিখুঁত হিসাব বের করেছেন তাতে ৩৬৫.২৪২২। এটুকু মাত্র ব্যবধানের জন্য বছরে ব্যবধান হয় ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের। ৩২৫ খ্রিস্টাব্দে নিকেয়ার সম্মেলনের সময় ৩৭১ বছরে প্রতি বছরের ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড করে জমে জমে তিনদিনের ব্যবধানে দাঁড়িয়েছিল। হাজার হাজার বছর পর এই ব্যবধান বিরাট হয়ে যাবে, বলাই বাহুল্য। তাই পঞ্চদশ শতকে বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হলেন। রোমে তখন রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। রোমের কর্তৃত্ব তখন খ্রিস্টবর্ষের প্রধান গুরু মহামান্য পোপের ওপর। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জুলিয়াস সিজারের সময় থেকে ১২৫৭ বছরে প্রতি বছরে ০.০০৭৮ বছরের ভুল জমে ৯.৮ দিনের দাঁড়িয়েছিল। পোপ গ্রেগরি ক্যালেন্ডারের বৈজ্ঞানিক সংস্কারের লক্ষ্যে ক্যালেন্ডারকে ১০ দিন এগিয়ে আনার হুকুম দিলেন। ফলে ৪ অক্টোবরের পরের দিনই ১৫ অক্টোবর ধরা হলো। গ্রেগরির সংস্কারে অধিবর্ষের ব্যাপারকেও আরো বিজ্ঞানভিত্তিক করা হলো। জুলিয়াস সিজারের ক্যালেন্ডারে ৪০০ বছরে ১০০টি অধিবর্ষ হয়েছিল। এতে তিনটি অধিবর্ষ বেশি ধরা হয়। তাই তাকে ৯৭টি ধরা হলো। গ্রেগরির সংস্কারে শতাব্দী শেষের বছরগুলোকে চার দিনে নয়, ৪০০ দিয়ে বিভাজ্য হলেই অধিবর্ষ গণ্য করার নিয়ম করা হলো। এই নিয়ম এখনো চলছে। এই ক্যালেন্ডারের আরো সূক্ষ্ম সংস্কারের প্রস্তাব আছে। তবে সে অন্য প্রসঙ্গ।
এবার আমাদের নিবন্ধের শিরোনামের এটি ‘ইংরেজি নববর্ষ’ কেন নয়, সে প্রসঙ্গ। প্রথম কথা হলো এ ক্যালেন্ডারের উদ্ভব ও যাবতীয় সংস্কারই হয়েছে রোমে, ইংরেজদের দেশে যা তাদের দ্বারা এর উদ্ভাবন বা সংস্কার কিছুই হয়নি। ভ্যাটিকানের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রবর্তিত এই ক্যালেন্ডারের বিরোধী ছিল ইংরেজরা। তাই ১৭০ বছর ইল্যান্ডে এর প্রচলন ঠেকিয়ে রাখে তারা। এর কারণ ধর্মীয়। ভ্যাটিকান ক্যাথলিক ধর্মের পীঠস্থান। আর ইংল্যান্ডের শাসক ও অধিকাংশ মানুষ প্রোটেস্টান। এদের বিরোধ মৌলিক। তাই ১৫৮২ সালে ক্যাথলিকদের দেশ ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ভ্যাটিকানের সংস্কারকৃত ক্যালেন্ডার সঙ্গে সঙ্গেই মেনে নিল। ১৫৮৩ সালে মেনে নিল নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড, পরের বছর জার্মানির শুধু ক্যাথলিকরা (প্রোটেস্টানরা ভাবলো এর মধ্যে কোনো সূক্ষ্ম ধর্মীয় চাল আছে)। অবশেষে ১৭০০ সালে গোটা জার্মানিতে চালু হলো এই নতুন ক্যালেন্ডার। ইংরেজরা আরো এক কাঠি সরেস। তারা ১৭৫২ সালে পার্লামেন্টে আইন পাস করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। তাই এ ক্যালেন্ডারকে কোনোমতেই ইংরেজি ক্যালেন্ডার বলা যায় না। আন্তর্জাতিকভাবে বহু দেশে গৃহীত হওয়ার ফলে এর গুরুত্ব, মর্যাদা ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। এ ক্যালেন্ডারকে রোমান বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার বলা যায়। একে ইংরেজি ক্যালেন্ডার বা এর প্রথম দিনকে ইংরেজি নববর্ষ বলা অজ্ঞতার পরিচায়ক। আর আজ তাই রোমান ক্যালেন্ডারের নববর্ষ বা আন্তর্জাতিক নববর্ষ।
শামসুজ্জামান খান: প্রাবন্ধিক, লোক-গবেষক ও কলাম লেখক।
http://www.jaijaidin.com/details.php?nid=168264
